চুক্তির মাধ্যমে ওয়াজের পারিশ্রমিক গ্রহণ ইসলামি দৃষ্টিকোণ —আবদুর রহমান হোসাইনী

প্রকাশিত: ২:২৩ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৭, ২০২১

চুক্তির মাধ্যমে ওয়াজের পারিশ্রমিক গ্রহণ ইসলামি দৃষ্টিকোণ —আবদুর রহমান হোসাইনী

চুক্তির মাধ্যমে ওয়াজের পারিশ্রমিক গ্রহণ
ইসলামি দৃষ্টিকোণ
—আবদুর রহমান হোসাইনী

প্রাককথন: ওয়াজ-নসিহত বা উপদেশ মানবজীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। এটি মানবসমাজের উন্নতি, অগ্রগতি, সফলতা ও সংশোধনের ক্ষেত্রে অতুলনীয় পন্থা। মানবজাতির ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনের পরিশুদ্ধি এবং আকিদা-বিশ্বাসের পবিত্র দ্বারা অদ্যবধি চলে আসছে। এমনকি ইসলাম পূর্ব যুগেও জনসাধরণের প্রতি ওয়াজ-নসিহতের বিষয়টি পাওয়া যায়। বিশ্ব মানবতার মুক্তির সনদ মহাগ্রন্থ আল কুরআনে উল্লেখ রয়েছে-
وَإِذْ قَالَ لُقْمَانُ لِابْنِهِ وَهُوَ يَعِظُهُ يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ ۖ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ [٣١:١٣]
“আর স্মরণ করো সে সময়ের কথা, যখন লুকমান তাঁর পুত্রকে ওয়াজ করতে (উপদেশচ্ছলে) গিয়ে বললো, হে আমার পুত্র! আল্লাহর সঙ্গে শিরক করো না। নিঃসন্দেহে শিরক চরম জুলুম”।
(সূরা লুকমান, আয়াত ১৩, তাফসিরে ইনে কাছির, খন্ড:৩, পৃ. ৫৮২)

★এক. প্রচলিত ওয়াজের শরয়ি বিধান : ওয়াজ-নসিহতের এ কল্লাণধারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে, সাহাবায়ে কেরাম, তাবিঈন, তাবে তাবেঈনের যুগ অতিক্রম করে বর্তমান যুগ পর্যন্ত উম্মতের আলিমদের মাধ্যমে অব্যাহত রয়েছে। যুগ স্বভাব ও পরিবেশের পরিবর্তনের কারণে যদিও এতে ব্যবস্থাগত কিছু বৈচিত্র এসেছে, তবে বর্তমান অবধি তা অব্যাহত আছে এবং থাকাও অপরিহার্য। যদিও বর্তমানে তাতে কিছু বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু বিচ্যুতি সত্ত্বেও ওয়াজের মৌলিক গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য।
ইসলামি আইনের উপর লিখিত কিতাবসমূহ অধ্যয়ন করলে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, সাধারণ অবস্থায় ওয়াজ করা সুন্নাত।
ফিকহে হানাফির নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ আদ্দুররুল মুখতারে উল্লেখ রয়েছে-
التذكير على المنابر للوعظ والاتعاظ سنة للأنبياء والمرسلين.
ওয়াজ করা এবং ওয়াজ শোনা (উপদেশ গ্রহণ করা) নবি-রাসুলগণের সুন্নাত।
(আদ্দুররুল মুখতার ৯/৬০৪)

এছাড়াও ইমাম আহমদ বিন হাম্বল, ইমাম ইবনুল আরাবি, ইমাম কুরতুবি ও আল্লামা শামিসহ অসংখ্য ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞরা ওয়াজ সুন্নাত হওয়ার ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন।
(আল মাওসুআতুল ফিকহিয়্যাহ ৪৪/৮০, মাতালিবু উলিন নুহা ২/২৬১, আবজাদুল উলুম ২/৫৩৫, আহকামুল কুরআন ৩/৭৪, শামি ১/৬০৪)

★দুই. ওয়াজ করে পারিশ্রমিক নেওয়ার বিধান :
১. কোনো প্রকার চুক্তি ছাড়া মাহফিল পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে বক্তাকে হাদিয়া হিসেবে যা কিছু দেওয়া হয়, তা নেওয়া সর্বসম্মতিক্রমে বৈধ। কেননা হাদিসে উল্লেখ রয়েছে-
হযরত খালিদ বিন আদি রাজি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শোনেছি- ‘যার নিকট তার ভাইয়ের পক্ষ থেকে কোনো ধরণের চাওয়া ছাড়া ন্যায়সঙ্গত কোনো কিছু পৌঁছে, সে যেন তা গ্রহণ করে, ফেরত না দেয়। কেননা ইহা একটি রিজিক, যা আল্লাহ তাআলা তার কাছে পাঠিয়েছেন।
(মুসনাদে আহমদ বিন হাম্বাল, হাদিস ১৭৮৬০)

কিফায়াতুল মুফতি কিতাবে উল্লেখ রয়েছে:
পূর্ব থেকে ওয়াজের পারিশ্রমিক নির্ধারিত না হলে এবং বক্তার মনোবাসনাও এমন না হলে যে, আমি অবশ্যই কিছু টাকা পাবো বা আমাকে কিছু দেওয়া উচিত ; বরং সে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই ওয়াজ করে। আর কেউ তাকে স্বেচ্ছায় কিছু টাকা দিয়ে দেয়, তাহলে এই টাকা দেওয়াও জায়েজ এবং বক্তার জন্য নেওয়াও জায়েজ।
২. চুক্তির মাধ্যমে পারিশ্রমিক নেওয়া।
ওয়াজ, আজান, তেলাওয়াত, ইমামাত ও তালিমসহ যে কোনো নেক কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়া যাবে কি না?
এ বিষয়টি নিয়ে ইসলামের মহামান্য ইমামগণের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে।
হানাফী মুতাকাদ্দিমিন (পূর্ববর্তী) ইমামদের মতে তালিম, ইমামত, আজানসহ যে কোনো নেক কাজের পারিশ্রমিক গ্রহণ করা নাজায়েজ।
খুলাসাতুল ফাতাওয়া কিতাবে উল্লেখ রয়েছে-
لايجوز الاستيجار على الطاعات كتعليم القران والفقه والأذان والتذكير والتدريس والحج والغزو.
নেক কাজ যেমন কুরআন শিক্ষা, ফিকাহ, আজান, ওয়াজ- নসিহত, তালিম, হজ্জ ও জিহাদ ইত্যাদির উপর ইজারা চুক্তি অবৈধ। তথা নেক কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়া নাজায়েজ।
(খুলাছাতুল ফাতওয়া, ৩/১১৪)

পূর্ববর্তী হানাফি আলেমগণ নেক কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ নাজায়েজ হওয়ার ফাতওয়া প্রদানের কারণ হলো, আগের যুগে আলেমদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব ইসলামি রাষ্ট্রের অধীনে ছিলো। এজন্য তারা নেক কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়া নাজায়েজ বলেছেন। কিন্তু বর্তমানে আলেমদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব যেহেতু রাষ্ট্রের অধীনে নয়। এজন্য এখন পারিশ্রমিক নেওয়া বৈধ।
(মাজমাউল আনহুর ৩/৫৩৪, ফাতাওয়ায়ে কাজিখান ২/৩২৫)

শাফেঈ মাজহাব, মালিকি মাজহাব ও হাম্বলি মাজহাব এবং পরবর্তী (মুতাআখখিরিন) হানাফি ইমামগণের ফাতওয়া হলো, ওয়াজ করে পারিশ্রমিক নেওয়া বৈধ। চাই তা চুক্তির মাধ্যমে হোক বা চুক্তিবিহীন হোক। কারণ, মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয় মূল্যবোধ তৈরির ক্ষেত্রে, এবং বিভিন্ন পথভ্রষ্ট বাতিল ফেরকার ঈমান বিধ্বংসী আকিদা-বিশ্বাস থেকে মুসলমানদের বাঁচানোর ক্ষেত্রে ওয়াজের গুরুত্ব অপরিসীম। যা বুঝ-বুদ্ধি সম্পন্ন প্রতিটি মুসলমানই স্বীকার করবে। এখন যদি ওয়াজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়াকে নাজায়েজ বলা হয়, তাহলে নিজের জীবিকা উপার্জন বাদ দিয়ে, পকেটের হাজার হাজার টাকা ব্যয় করে এ ময়দানে কাজ করার মতো লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। ফলশ্রুতিতে মুসলিম উম্মাহ বাতিল পন্থিদের ঈমান বিধ্বংসী ফিতনার ফাঁদে আটকা পড়ে পথভ্রষ্ট হবে। তাছাড়া এই খেদমতে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গের প্রচুর সময়ও ব্যয় হয়, যে সময়ে ইচ্ছা করলে তাঁরা জীবন-জীবিকা উপার্জন করতে পারতেন। এই সময় দানের বিনিময়ে তারা পারিশ্রমিক চাইতে পারে এবং তাদেরকে পারিশ্রমিক দেওয়াও জরুরী। নইলে এই ময়দানে শূন্যতা সৃষ্টি হয়ে বহুবিধ সমস্যা দেখা দিবে।
একারণে উলামায়ে কেরামগণ ওয়াজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়াকে জায়েজ বলেছেন। আর পারিশ্রমিক সাধারণত চুক্তির মাধ্যমেই নির্ধারণ হয়ে থাকে। এজন্য চুক্তির মাধ্যমে ওয়াজের পারিশ্রমিক নেওয়া বৈধ।
তাছাড়া- দ্বীনী কাজের দায়িত্ব পালনের জন্য যে পারিশ্রমিক দেওয়া হয়, তা একদিকে কাজের বিনিময়। অন্যদিকে দ্বীনী কাজে আবদ্ধ থাকায় জীবিকা উপার্জন করতে না পারার কারণে তাঁর প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের আয়োজন। সুতরাং সার্বিক বিবেচনায় ওয়াজের জন্য হাদিয়ার নামে পারিশ্রমিক আদান-প্রদান করাকে খারাপ নজরে দেখার সুযোগ নেই। এই পারিশ্রমিকটা সময় দানের বিনিময় হবে। আর যাতায়াতের ব্যয়ভার তো বহন করতেই হবে।
(আয যখিরাহ ২/৬,৬৭, শারহুয যুরকানি ১/১৬২, মাওয়াহিবুল জালিল ১/৪৫৫-৪৫৭, আল ইনসাফ ১/৪০৭, রাওযাতুত তালিবিন ৫/১৮৭, আল মিনহাজ ১৪/১৮৮, মুগনিল মুহতাজ ২/৩৪৪, শরহু মুনতাদাল ইরাদাত ২/৩৬৬, আল ফুরু ৪/৪৩৫)

আল ফাতওয়াল বাজজাজিয়্যাহ গ্রন্থে উল্লেখ হয়েছে-
الاستئجار على الطاعات كتعليم القران والفقه والتدريس والوعظ لا يجوز أي لا يجب الأجر وأهل المدينة طيب الله ساكنها- جوّزوه- وبه أخذ الإمام الشافعي قال في المحيط: وفتوى مشايخ بلخ على الجواز، قال الإمام الفضلي: والمتأخرون على جوازه.
নেক কাজের যেমন কুরআন ও ফিকাহ শিক্ষা, পাঠদান এবং ওয়াজ-নসিহতের উপর ইজারা চুক্তি বৈধ নয়। অর্থাৎ এসব কাজের ইজারা চুক্তি করলেও পারিশ্রমিক ওয়াজিব হয় না। তবে মদিনার ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞরা এসব নেক কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়াকে জায়েজ বলেছেন। ইমাম শাফেঈ রাহি.ও জায়েজ হওয়ার মতটি গ্রহণ করেছেন। মুহিতের মধ্যে উল্লেখ রয়েছে, বলখের উলামায়ে কেরামগণ জায়েজ হওয়ার ফাতওয়া দেন। ইমাম আবু বকর রাহি. বলেন- পরবর্তী হানাফি ইমামগণ এসব নেক কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়াকে বৈধ বলেছেন।
রদ্দুল মুহতার কিতাবে উল্লেখ রয়েছে-
ويفتى اليوم بصحتها لتعليم القران والفقه والإمامة والأذان. قال الشامي: وزاد بعضهم الاذان والإقامة والوعظ.
বর্তমানে কুরআন ও ফিকাহ শিক্ষাদান, ইমামতি, আজান ইত্যাদির পারিশ্রমিক গ্রহণের ব্যাপারে বৈধতার ফাতওয়া দেওয়া হয়। শামি রাহি. বলেন- কোনো কোনো ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞ আজান ইকামত ও ওয়াজকে এর অন্তর্ভুক্ত করেছেন। অর্থাৎ, আজান ও ইকামত দিয়ে এবং ওয়াজ করে পারিশ্রমিক নেওয়া বৈধ।
আল্লামা রশিদ আহমদ গাংগুহি রাহি. রচিত ফাতওয়ায়ে রশিদিয়ায় উল্লেখ রয়েছে
‘প্রশ্ন-ওয়াজ করে পারিশ্রমিক নেওয়ার হুকুম কি?
উত্তর : পরবর্তী হানাফী ইমামগণ প্রয়োজনের কারণে ওয়াজ করে পারিশ্রমিক নেওয়াকে জায়েজ বলেছেন।’

হাকীমুল উম্মত মুজাদ্দিদে মিল্লাত আল্লামা আশরাফ আলি থানবি রাহি. এমদাদুল ফাতাওয়া গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন,
‘প্রশ্ন: ইমামতি ও ওয়াজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়া বৈধ কি না?
উত্তর : নেক কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়া নাজায়েজ. তবে ইমামতি করে পারিশ্রমিক নেওয়া জায়েজ। আর ওয়াজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়াকে কেউ কেউ জায়েজ বলেছেন; আবার কেউ কেউ নাজায়েজ বলেছেন। তো এই বিপরীতমুখী মন্তব্যদ্বয়ের মধ্যে এভাবে সমন্বয় সাধন করা যায় যে, ইমামতের মতো যদি ওয়াজের নিয়মতান্ত্রিক দায়িত্ব নিয়ে নেয় বা ওয়াজকে নিজের পেশা বানিয়ে নেয়, তাহলে ওয়াজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়া বৈধ। কিন্তু দায়িত্বে নিয়োগ ছাডা বা ওয়াজকে নিজের পেশা বানানো ব্যতীত ওয়াজ শুরু করার প্রাক্কালে ওয়াজের পারিশ্রমিকের শর্ত করলে তা জায়েজ হবে না। যেমনিভাবে দায়িত্বে নিয়োগবিহীন নামাজের ইমামতি করলে পারিশ্রমিক নেওয়া জায়েজ নয়।’
(ইমদাদুল ফাতাওয়া ৩/৩৮৯)

★তিন. ওয়াজ করে পারিশ্রমিক নেওয়া বৈধ হওয়ার জন্য দু‘টি শর্ত রয়েছে।
এক. দৈনন্দিন, সাপ্তাহিক, মাসিক বা বাৎসরিক ওয়াজের জন্য চুক্তিবদ্ধ হওয়া। অর্থাৎ এভাবে চুক্তিবদ্ধ হওয়া যে, প্রতিদিন, প্রতি সপ্তাহে, বা প্রতি মাসে মাগরিবের পরে একঘন্টা বয়ান করবো।
দুই. নিজেকে ওয়াজের জন্য ফারেগ রাখা। অর্থাৎ কেউ ওয়াজের জন্য দাওয়াত দিলে তার দাওয়াতে সাড়া দিয়ে ওয়াজ করতে যাওয়া। উক্ত দুই সুরতে ওয়াজ করে পারিশ্রমিক নেওয়া বৈধ। চাই তা চুক্তির মাধ্যমে হোক বা চুক্তিবিহীন হোক। কিন্তু উক্ত দুই পদ্ধতি ছাড়া হঠাৎ কাউকে ওয়াজ করার জন্য বলা হলে, তার জন্য পারিশ্রমিক চাওয়া বৈধ নয়। যেমনিভাবে মসজিদে নামাজ পড়ানোর জন্য কাউকে নিয়োগ দেওয়া হলে, তার জন্য পারিশ্রমিক নেওয়া বৈধ। কিন্তু দায়িত্বে নিয়োগবিহীন নামাজের সময় হঠাৎ কাউকে যদি ইমামতির জন্য বলা হয়, তাহলে তার জন্য ইমামতির বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়া বৈধ নয়।
(ইমদাদুল ফাতওয়া ৩/৩৮৯, আহসানুল ফাতওয়া ৭/৩০০)

★চার. অতিরিক্ত বিনিময়ের চাহিদা :
এক. পারিশ্রমিক নেওয়া বৈধ হলেও এটা নিছক কোনো পণ্য বিক্রির মূল্যের মতো নয়। তাই তা নিয়ে দর কষাকষি করা বা বেশি চাহিদা পেশ করা ঠিক নয়। পণ্য কেনা-বেচার মতো দরদাম করা, অগ্রীম বুকিং মানি নেওয়া, চাহিদার চেয়ে টাকা একটু কম হলে ওয়াজে না যাওয়া-উলামায়ে কেরামের শান, মান ও ইজ্জতের সঙ্গে মানানসই নয়। এতে দ্বীনের অসম্মান হয়। তাই তা মাকরুহে তাহরীমী।
দুই. ইসলাম ভারসাম্যপূর্ণ মধ্যপন্থার আদর্শ। ব্যবসা বাণিজ্যের মধ্যেও তো অতিমাত্রায় মুনাফাখোরী ইসলাম সমর্থণ করে না। ওয়াজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়া বৈধ হলেও ইচ্ছামতো দাম হাঁকানো ইসলামি অর্থনীতির মূলনীতি পরিপন্থী। কোনো পণ্যের বাজার চাহিদা বেশি হয়ে গেলেই স্বেচ্ছাচারী মূল্যে তা বিক্রি করা ইসলামের দৃষ্টিতে ঠিক নয়। বরং উৎপাদনব্যয় বা ক্রয়মূল্যের সাথে মিল রেখেই মূল্য নির্ধারণ করা ইসলামি অর্থনীতির একটি মূলনীতি। সেদিক থেকেও চড়া দাম হাঁকিয়ে ওয়াজ করা ঠিক নয়। তবে যৌক্তিক পরিমাণ সময়দান ও রাস্তার ব্যয় ইত্যাদির হিসাবে পারিশ্রমিক গ্রহণ করতে কোনো বাধা নেই।
(কিফায়াতুল মুফতি ৭/৩১৯, ৩৩০, আহসানুল ফাতাওয়া ৭/২৮০)

★পাঁচ. পারিশ্রমিক নিলে সওয়াব হবে কি ?
যদি দ্বীনের খেদমতের নিয়তে ওয়াজ করে প্রয়োজনের কারণে বিনিময় নিয়ে থাকে, তাহলে সওয়াব পাবে। আর সাধারণত দ্বীনী খেদমত কেউ টাকার জন্য করে না। বরং দ্বীনী খেদমত করতে গেলে টাকার প্রয়োজন হয়, এজন্য টাকা নেওয়া হয়। তবে যদি কেউ শুধু টাকা কামানোর জন্য ওয়াজের পেশাকে গ্রহণ করে, তাহলে সওয়াব পাবে না। ওয়াজের পারিশ্রমিক নিয়ে বাড়াবাড়ি করা, নিজের চাহিদার একটু কম দিলে পরের বছর দাওয়াত গ্রহণ না করা এবং দুই মাহফিলের মধ্যে যেখানে টাকা বেশি পাওয়া যায়-সেখানের দাওয়াত গ্রহণ করা ইত্যাদি কারণেও সওয়াব পাবে না। কারণ এরকম করা টাকার প্রতি লোভের পরিচায়ক। তবে প্রত্যেকের নিয়ত তার অন্তরের বিষয়, তাই নিয়তের উপর আঘাত করার অধিকার কারো নেই। সুতরাং কোনো বক্তাকে নিয়তের কারণে দোষারোপ করা যাবে না।
(ইমদাদুল ফাতওয়া ৩/৩৪০)

১৭/১/২০২১ ইংরেজি
সন্ধ্যা পাঁচটা পঁয়ত্রিশ মিনিট
উত্তরখান, ঢাকা

  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ