নার্স হালিমার হুংকার, ‘মাস্ক পরব না, তুই বলার কে?’

প্রকাশিত: ৮:২৫ পূর্বাহ্ণ, মে ১৫, ২০২১

নার্স হালিমার হুংকার, ‘মাস্ক পরব না, তুই বলার কে?’

নিজস্ব প্রতিবেদক

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে দেশব্যাপী চলছে কঠোর লকডাউন। সরকারের তরফ থেকে বারংবার মাস্ক পরিধান করা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার আহবান জানানো হলেও খোদ স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মীরাই স্বাস্থ্যবিধি মানতে নারাজ। বরং মাস্ক পরিধান করবেন না বলেও হুমকি দিচ্ছেন। এমন ঘটনা ঘটেছে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। ওই হাসপাতালের হালিমা আক্তার নামের এক নার্সকে মাস্ক পরতে বলায় চটে যান তিনি। চড়াও হন রোগীর স্বজনদের উপর। ঈদে দিন বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এ ঘটনাটি ঘটেছে। ঘটনার ছবি ও ভিডিও ফুটেজ ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সেখানে অনেকেই ক্ষুব্ধ মন্তব্য করছেন অনেকেই। জানা গেছে, নার্স হালিমাকে হাসপাতালের চিকিৎসকরাও ‘বেয়াদব’ বলে জানেন।

জানা গেছে, ২০২০ সালে করোনাসংক্রমণের শুরু থেকেই কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে করোনা টেস্ট শুরু হয়, যা অদ্যাবধি পর্যন্ত চলমান রয়েছে। একই হাসপাতালে চলছে ভ্যাকসিন প্রদান কার্যক্রমও।

গত ১০ মে সকালে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ১৫ দিন বয়সী শিশু হোসাইনকে নিয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন গাছগড় গ্রামের গৃহবধূ ফাতেমা বেগম। কিন্তু শিশু হোসাইনের অবস্থার কোনো উন্নতি হচ্ছিল না। ফাতেমার ব্যবহৃত মুঠোফোনটিও বিকল হয়ে যায় হাসপাতালে থাকাবস্থায়। উপায়ান্তর না দেখে শুক্রবার ঈদুল ফিতরের দিন বিকেলে ফাতেমার ভাই আইনজীবী জাকির হোসেন সুমন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা সদরে তার পরিচিত এক ছোটভাইকে অনুরোধ জানান স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে হোসাইনের অবস্থা দেখে জাকিরকে বিস্তারিত জানানোর জন্য।

জাকিরের কথামতো ওই যুবক শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৫টায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে এডভোকেট জাকিরের সাথে তার বোনের কথা বলিয়ে দেন। এরপর জাকির ওই যুবককে কর্তব্যরত চিকিৎসক বা নার্সের সাথে কথা বলে শিশুটির অবস্থা সম্পর্কে জানতে বলেন। তার কথামতো ওই যুবক কর্তব্যরত চিকিৎসকের রুমে উপস্থিত হন। কোনো চিকিৎসক না থাকলেও সেখানে বসা ছিলেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নার্স হালিমা আক্তার।

স্বাস্থ্যবিধি না মেনে মাস্ক পরিধান না করেই হাসপাতালের স্টাফদের সাথে খোশগল্পে ব্যস্ত ছিলেন তিনি। এসময় রোগীর স্বজন ওই যুবক হালিমাকে মাস্ক পরিধানের জন্য অনুরোধ জানান। তাৎক্ষণিক তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেন নার্স হালিমা।

তিনি চিৎকার করে বলেন, ‘আমি মাস্ক পরব না, কি সমস্যা? আমি মাস্ক পরব কি পরব না, সেটা বলার তুই কে?’ রোগীর স্বজন আবারও ওই নার্সকে মাস্ক পরার অনুরোধ জানালে তিনি আরও চটে যান৷ নার্স হালিমা রোগীর স্বজনদের সাথে দুর্ব্যবহার করেন।

তার চিৎকার শুনে হাসপাতালের স্টাফ এবং হাসপাতাল সংলগ্ন ফার্মেসির দালালেরা ছুটে আসেন। এসময় সকিনা বেগম নামের হাসপাতালের এক স্টাফ বারবার হালিমাকে চুপ করার জন্য অনুরোধ জানালেও তা কানে নেননি ওই নার্স। খবর পেয়ে স্থানীয় কয়েকজন সংবাদকর্মী ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। হালিমা এসময় সংবাদকর্মীদের উপর হামলে পড়েন।

স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথে অশোভন আচরণ, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কটুক্তি এবং ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়ারও চেষ্টা করেন নার্স হালিমা আক্তার। এসময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন আরিফুল ইসলাম রুবেল নামে এক চিকিৎসক। তিনিও ঘটনাটি জেনে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেন।

হাসপাতালে থাকা রোগী ও তাদের স্বজনেরা জানান, নার্স হালিমা বরাবরই তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করে আসছেন। এমনকি করোনা মহামারীর এই সময়ে মাস্ক পরিধান না করে ডিউটি পালন করে নিজেকে এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের হুমকির মুখে ফেলছেন ওই নার্স। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় আড়াই বছর ধরে  হাসপাতালের কিছু স্টাফ এবং হাসপাতাল সংলগ্ন ফার্মেসী দালালদের নিয়ে একটি সংঙ্গবদ্ধ চক্র তৈরি করে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে দুর্নীতির আখড়া বানিয়েছেন নার্স হালিমা আক্তার। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। কিন্তু দাপট এতটাই যে, হাসপাতালের আরএমও এবং টিএইচও পর্যন্ত নীরব থাকেন এবং নার্স হালিমার অসদাচরণ ও দুর্নীতির অসংখ্য অভিযোগ থাকা স্বত্বেও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নি।

এদিকে রোগীর স্বজন এবং সাংবাদিকদের সাথে দুর্ব্যবহারের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলাজুড়ে। এঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকার সচেতন মহল। তারা বলেন, একজন সেবিকার কাছ থেকে এরকম আচরণ কখনোই কাম্য নয়। মানুষ চিকিৎসা সেবা পাওয়ার জন্য হাসপাতালে গিয়ে লাঞ্চিত হবে এটা হতে পারে না। অবিলম্বে নার্স হালিমাকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা হোক।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক বলেন, হালিমা মেয়েটা আসলেই বেয়াদব।

এ ব্যাপারে ঈদের ছুটিতে থাকা কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (টিএইচও) কামরুজ্জামান রাসেল বলেন, আমি বিষয়টি দেখছি।

সিলেটের সিভিল সার্জন প্রেমানন্দ মন্ডল এ ব্যপারে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, আমরা অভিযুক্ত নার্সকে শোকজ করব এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

  •  

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ